Insights / Awareness · Bengali

সাইবার কথন প্রথম কিস্তিঃ “Best Defense is Common Sense”

A padlock at the centre of a circuit pattern

প্রথমেই কিছু কথা বলে নেই। চারপাশে হাজার হাজার সাইবার বিশেষজ্ঞ দেখা যায় আজকাল। একসময় দেশের ঘরে ঘরে ডাক্তার ছিলো যা আজ পরিবর্তিত হয়ে সাইবার বিশেষজ্ঞে রূপ নিয়েছে। পেশাজীবনে আমি সাইবার সিকিউরিটি প্রফেশনাল, সহজ বাংলায়, সাইবার সিকিউরিটিই আমাকে ভাত-কাপড় যোগায়। আমার লেখাগুলোর সাথে অতি অবশ্যই রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, ইসলামের ইতিহাসের মানুষদের লেখার মিল পাবেন না এবং কোন কোন ক্ষেত্রে একেবারেই বিপরীত কথা পাবেন। আশা করি ধৈর্য্য নিয়ে লেখাগুলো পড়বেন।

বাস্তব জীবনের কথা চিন্তা করুন। আপনি কি আপনার বাসার দরজা খুলে রাত্রে ঘুমাবেন? বিদ্যুৎ আছে কিনা সেটা জানার জন্য আপনি কি বৈদ্যুতিক সকেটের ভেতরে আংগুল ঢুকাবেন? আপনি কি আপনার সাইন করা ব্লাংক চেকের পাতা রাস্তায় ফেলে রাখবেন? তিনটা প্রশ্নেরই উত্তর “না” এবং আপনি ইতমধ্যেই মনে মনে ভাবতে শুরু করেছেন এসব প্রশ্নের সাথে “সাইবার” এর সম্পর্ক কি? সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও সাইবার সিকিউরিটি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সেকারনে এটা নিশ্চিত করতে হবে বাস্তব জীবনের উদাহরণ থেকেই। এবার আসুন এই প্রশ্নগুলোর উত্তরগুলোকে একটু মিলিয়ে নেই সাইবার সিকিউরিটির সাথে।

আপনি কোন অবস্থাতেই বাসার দরজা খুলে রাত্রে ঘুমাতে যান না কারন আপনি জানেন যে রাত্রে দরজা খুলে ঘুমানো মানেই চোর-দাকাত দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসার মত ব্যপার। অথচ সেই আপনি আপনার কম্পিউটার স্ক্রিনটি আনলক অবস্থায়, মেইল ফেসবুক খুলে রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একবারও ভেবে দেখছেন না যেকেউ সেখানে বসে যেকোন কিছুই করতে পারে। আপনার মেইল একাউন্ট আপনার ডিজিটাল পরিচয়। আপনার মেইলের কন্ট্রোল নিয়ে নেয়ার অর্থ আপনার ফেসবুক, টুইটার থেকে শুরু করে আপনার সব ধরনের ডিজিটাল প্রোফাইলের পাসওয়ার্ড রিকভারী মেকানিজমের কন্ট্রোল নিয়ে নেয়া। অনেককে আবার দেখা যায় (বিশেষ করে নব্য যুগলদের ক্ষেত্রে) একজন আরেকজনার সব পাসওয়ার্ড শেয়ার করে! কিছুদিন পরে যখন সম্পর্ক থাকে না তখন দেখা যায় একজনা আরেকজনাকে ব্লাকমেইল করছে সেই পাসওয়ার্ডের জোরেই! এমন বেশ কিছু অভিযোগ সাম্প্রতিককালে পেয়েছি এবং এই হার দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। আপনার পাসওয়ার্ড শেয়ারিং যদি হয় সম্পর্কের ভিত্তি তাহলে বলতে বাধ্য হচ্ছি আপনি সম্ভবত ভুল মানুষটিকে বেছে নিয়েছেন। কর্পোরেট অফিসগুলোতে খুবই ভয়াবহ একটা প্র্যাক্টিস দেখা যায়। নিজের দেস্ক ছেড়ে অন্য ডেস্কে ঘুরে বেরান তারা কম্পিউটারে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল খোলা রেখেই! এই কাজের মাধ্যমে তিনি যে শুধু নিজের বিপদ ডেকে আনেন তাই না, অনেক ক্ষেত্রেই কর্মস্থলের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও চলে যায় অন্যের হাতে। বেশ কিছু কর্পোরেট হাউজে একটি প্র্যাক্টিস চালু আছে। আমি যেকোন জায়গায় কথা বললেই এই প্র্যক্টিস মানতে বলি। প্র্যাক্টিসটা হচ্ছে কোন কলিগের মেইল আনলক অবস্থায় খোলা পেলেই সেখান থেকে বাকি কলিগদের কাছে (সর্বোচ্চ বসসহ) পরবর্তি দিনের লাঞ্চ কিনবা ডিনার ইনভাইটেশন পাঠিয়ে দেয়া। এভাবে দুই একদিন গাটের পয়সা গেলে সচেতনতা আসতে বাধ্য! এটা অনেকটা মজা করার মাধ্যমেই সতর্ক করা! আপনার কিবোর্ডের উইন্ডোজ এবং L বাটনদুটো একসাথে চাপলেই কিন্তু কম্পিউটার লক হয়ে যায়! শুধুই দুইটা বাটন প্রেস করলেই আপনি ঝুকিমুক্ত!

উইন্ডোজ + L চাপলে কম্পিউটার লক হয়

এবার আসি দ্বিতীয় প্রসংগে, বিদ্যুৎ আছে কিনা সেটা জানতে আপনি নিশ্চিতভাবেই কখনো সকেটে আংগুল ঢুকাবেন না। আপনি টেস্টার ব্যবহার করবেন কিনবা সুইচ দিয়ে দেখবেন বাতি জ্বলে কিনা। এই সতর্ক আপনিই কিনা আপনার মেইলে আসা অচেনা সেন্ডারের মেইলে থাকা লোভনীয় অফারের লিংকে ক্লিক করেন। সেই আপনিই ফেসবুক মেসেঞ্জারে আসা লিংক কিনবা একটু অন্যরকম 😉 লিংকে সুযোগ পেলেই ক্লিক করে বসেন! এতে কি করছেন আপনি? এতে আপনার প্রোফাইল কিনবা মেইল আপনি নিজেই হ্যাক করার রাস্তা পরিষ্কার করছেন। ডিজিটাল জগতের থাম্বরুল হচ্ছে অচেনা লিংকে ক্লিক না করা। এমনকি সেটা যদি আসে বন্ধু কিনবা কাছের লোকজনের কাছ থেকেও। আপনার অফিসের কম্পিউটারটি অতি অবশ্যই বহু গুরুত্বপূর্ণ ডাটা স্টোর করে। সেই পিসিতে কিনবা ল্যাপটপে বসে আপনি “সানি লিওনের নতুন ভিডিও” লিংকে ক্লিক করার মানে হচ্ছে পুরো পিসির ডাটাগুলোকে হুমকির মধ্যে ফেলা। সাইবার অপরাধীরা প্রায়শই হট নিউজ, শকিং কিনবা উত্তেজক ছবি, লোভনীয় অফার সংক্রান্ত লিংক পাঠায় শুধুমাত্র আপনা ডিজিটাল একাউন্ট কিনবা কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রন নিতে। এ সংক্রান্ত খুব প্রচলিত একটি বাক্য আছে। Think Before You Click! যেকোন লিংকে ক্লিক করার আগে থামুন এবং ভাবুন। তারপরে ক্লিক করুন।

Think Before You Click

তৃতীয় প্রশ্নটি ছিলো ব্লাংকচেক সংক্রান্ত। কেউই তার সই করা ব্ল্যাংক চেকের পাতা রাস্তায় ফেলে রাখবেন না। তাহলে ডিজিটাল জগতে আপনার ব্লাংক চেক হচ্ছে আপনার ক্রেডিট কিনবা ডেবিট কার্ড। প্রতিদিনই আমাদেরকে সেই কার্ডটি ব্যবহার করতে হয় অনলাইনে কিনবা অফলাইনে। অনেকেই আছেন অনলাইনে যেখানেই কার্ডের তথ্য চান দিয়ে দেন। এর মাধ্যমে কার্ডের তথ্য হ্যাকারদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুকি বাড়াচ্ছেন আপনি। আপনার কার্ডের তথ্য গোপনীয়। সেই তথ্য অন্য কেউ পেয়ে যাওয়ার মানেই হচ্ছে সেই কার্ডের অপব্যবহার। আপনার কার্ডটিকে ব্যবহার করা হতে পারে অনলাইন কেনাকাটায়। আমাদের দেশের খুব সাধারণ একটা প্র্যাক্টিস হচ্ছে রেস্টুরেন্টে যেয়ে খাওয়া শেষে কার্ডটি ওয়েটারের কাছে দিয়ে দেয়া। এখন যদি ওয়েটার সেই কার্ডের একটি কপি নিজের কাছে রেখে দেয়, আপনার বুঝার কোন উপায় আছে কি? সেই তথ্য দিয়ে কিন্তু অনলাইনে কেনাকাটা করা মামুলি ব্যপার! দুই একটা ব্যাংক বাদে বাকিসব ব্যংকে ট্রাঞ্জেকশনের জন্য পিন কোড কিনবা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড দিতে হয় না। ফলে সেসব ব্যাংকের কার্ড ওয়েটারের কাছে দিয়ে আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন তার ভরসায়। ভেবে দেখুনতো এই একই কাজটা অন্যভাবে করতে পারেন কিনা? খাওয়া শেষে বের হওয়ার সময় নিজে ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়িয়ে চোখের সামনে পে করলে এই ঝুকি অনেকটাই কমে যায় কিন্তু!

শিকল আর তালা দিয়ে বাঁধা একটি ক্রেডিট কার্ড

Originally published on LinkedIn · November 28, 2017